Skip to content Skip to footer

নিঃসঙ্গ নক্ষত্র


নিঃসঙ্গ নক্ষত্র
বাঁধন শিকদার

চারদিকে আজ কত বসন্ত লেগেছে , কত রঙের ফুলে ভরে গিয়েছে বৃক্ষগুলো । কিন্তু সেই রঙের কোন আভা আমাকে স্পর্শ করতে পারে নি। আজকাল হৃদয় আঙ্গিনায় সঙ্গি বিহনে সময়ের পর সময় কেটে যায়। 
সেই কবে থেকে আমার ভেতরকার রূপটা বড় একাকী, নিঃসঙ্গ ডানাভাঙা পাখির মতো কাতরে মরতেছে । আজ আমাকে সঙ্গ দেওয়ার মতো কোন পক্ষীকে ও খুঁজে পাই নি আমি ।
উড়ে যাওয়া পাখির ঝাঁক আজ বড় বেশি ব্যতিব্যস্ত শুধু নিজেদের বাসা বুনতে। বয়স বেড়ে যাওয়ার পর পৃথিবীটা কত স্বার্থপর হয়ে গেছে। নিত্য খোঁজ নেওয়া মানুষগুলো ও আজ নিখোঁজ।
আমার  ভালোবাসার ছেলেগুলো কেমন আছে, আজ আর সেটা জিজ্ঞেস করার দরকারও  মনে করি না। 

জিজ্ঞেস করতে গিয়ে যদি অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। হয়তো বা সেই ভয় তাড়া করে মারে আজ আমাকে।
তাদের সাথে যোগাযোগ করার ও কি মুখ আমার রয়েছে ?
তাদের তো আমি কম কষ্ট দেয় নি । তাদের ভালোবাসা গুলো আমার কাছে হাসি -তামাশা ছাড়া কিছুই ছিল না।
সেই সব ভালোবাসা গুলো আমার কাছে শুধু তাসের ঘরের মতোই ছিল ।
হয়ত চাইলে রাজপ্রাসাদ ও হতে পারত।  তখন রাজপ্রাসাদ বানানোর কথা না ভাবলে ও আজ বড্ড বেশি ভাবি , রাজপ্রাসাদ না হলে একটা শক্তপোক্ত কুটির চাই ।যে কুটিরে হাজারো ঝড় উঠলে ও ভাঙবে না,আগলে রাখত পারব ভালোবাসার শক্তি দিয়ে।
সত্যি কি আজব আমি ! আমার মুখে আজ ভালোবাসা , সঙ্গী চাই এসব কথা আওড়াচ্ছি। কিন্তু কিছু বছর পূর্বে আমি এই ভালোবাসার ঘোরবিরোধী ছিলাম।
কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে পরিপূর্ণ পরিবর্তিত করেছে ।

বয়সের ভাড়ে আজ সবার কাছে আমি একটা অচলতি সামগ্রী হয়ে গিয়েছি । সঙ্গি ছাড়া কেটে যাচ্ছে আমার ঘোরাক্রান্ত জীবন , তুচ্ছ দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃক্ষের মতো।
মাঝেমধ্যে ঘরের এক কোণে বসে কান্নাকাটি করি  , শুধু একটা সঙ্গীর জন্য । যে আমাকে  একটু সময় দিবে ,হয়ত একটু ভালোবাসবে । কিন্তু একটা মানুষ খুঁজে পাওয়া আমার জন্য এভারেস্ট জয়ের মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকাল। কি হবে এত টাকা-পয়সা দিয়ে আজ ? যদি জীবনে এতটুকু সুখ খুঁজে না পাই । জীবনের ৪৫ বছরের দাড়গোড়ায়  কঠিন বাস্তবতা ঠিকই বুঝতে পারছি । সবাইকে ভালোবাসার জালে ফাঁসিয়ে শুধু তাদের শরীর নিয়ে খেলেছিলাম এক সময় । তখন অনেক ছেলে  না চাইতে আমার  সাথে ডেটিংয়ে যেত , কোন ছেলেকে  দুই  মাসের বেশি রাখি নি । কিন্তু আজ বুঝতে পারছি  জীবনে একজন জীবন সঙ্গী গুরুত্ব কতটুকু।
আজ বড্ড ইচ্ছে করছে সে যুবক বয়সে ফিরে যেতে ? যে সময়ে ফিরে গেলে আমাকে জীবন সঙ্গী হিসেবে মেনে নিতে কারো আপত্তি থাকবে না। ফিরতে চাইলে কি সত্যি ফেরা  !  , অতীত , ভেঙে যাওয়া জায়গায়? ভালোবেসেছিলাম অনেক পুরুষ কে কিন্তু প্রতিনিয়ত নতুন সঙ্গী খোঁজার নেশায় বারবার আমি আবার ও একাকী হয়ে গিয়েছি।
ভালোবাসতে পারেনি কখনো আমি আলাদা ভাবে একক কোন পুরুষকে ।কেন জানি একেক পুরুষের আলাদা আলাদা অঙ্গ আমাকে আকৃষ্ট করত , কাছে টানতো তাদের সাথে মেতে উঠতে আদিম নেশায় । আদিম খেলা শেষ হয়ে গেলে মনের ভিতর থেকে সেই ভালোবাসা গুলোকে টেনে উপরে ফেলে দিয়েছি হৃদয় নিংড়ে।  মাতাল হয়ে মাতম করে বেড়েয়েছি নতুন কোন ভালোবাসা পাওয়ার জন্য । নতুন কোন পুরুষের ছোঁয়া পাওয়ার জন্য। সবাই খুব ভালোভাবে আমাকে গ্রহন করত সে সময়, যৌবন কালে সবার মতো আমার মূল্য ও কম ছিল না। অনেক ছেলে কেঁদেছে ও ভালোবাসা বিচ্ছেদ এর সময় । এখন ও মনে পড়ে , রাসেল নামের একটা ছেলে আমাকে ভালোবাসার জন্য আত্মহত্যা ও করেছিল ।  কিন্তু তাদের ভালোবাসা , তাদের আবেগ , কষ্ট কখনো আমার হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারে নি । আমি ঠিকই তাদের ভালোবাসা কে উপেক্ষা করে, মেতে উঠতাম নতুন কারো ভালোবাসার ,নতুন কোন পুরুষের ছোঁয়ায়। কিন্তু এখন কেন আমি এত একলা , আজ কেন আমার ডাকে কেউ সাঁড়া দেয় না ।
আজ আমার সেই শরীর , সেই চেহেরা নেই বলে ?
গৌধুলীর টুকরো টুকরো মেঘের সাথে শেষ আলোটুকো কবে যে  লুকোচুরি খেলতে খেলতে নিভে গেল বুঝতে ও পারলাম না। আজকাল একটা হাত বড্ড খুঁজে বেড়াই
, যার হাত ধরে পাড়ি দিতে পারব জীবনের শেষ অবধি ।যে হাতের ছোঁয়ায় ঘুমিয়ে পড়ব রাতের বেলায়, আবার জেগে উঠব সকাল বেলায় । আজ সমস্ত দুয়ার খুলে রেখেছি , শুধু একজনের অপেক্ষায়। শুধু আশায় আশায় চেয়ে আছি তার পানে।  যে সকাল বিকাল নিয়ম করে আমার সাথে বাইরের বাগানে ঘুরতে যাবে ।  আমি পড়ে যেতে চাইলে চাইলে ,হাতটা শক্ত করে ধরে আমাকে রক্ষা করবে । জীবনে আজ বেঁচে থাকা যেন অনেক কষ্টের হয়ে উঠেছে । তবু আমি বেঁচে থাকতে চাই ,ভালোবাসতে চাই পাগলের মত কাউকে।
সত্যি ভালোবাসতে চাই , যার দুহাত ধরে  চিবুকে চুম্বন এঁকে দিতে পারব । যার ভালোবাসার ছোঁয়ায় আমার নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমবে।তারপর কানের লতিতে আলতো করে কামড়ে দিব  ,চুলের ভাঁজে মুখ লুকিয়ে ঘ্রান নিতেও মন্দ লাগবে না ।

   কিন্তু এত সুগভীর ভালোবাসার দেওয়ার জন্য সত্যিই  আমি কাউকে পাচ্ছি না ?  আমার মতো সবাই আজ আমাকে উপেক্ষা করছে , ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে ।ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছে আমার সব আশা যেভাবে আমি ও একসময় অন্যদের দিতাম।

আজ একজন তুমি ছাড়া আমি বড্ড একা , ঠিক ওই আকাশের একলা নক্ষত্রের মতো । কেন্দ্রবিহীন এই কক্ষপথে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি  , শুধু একজন প্রানসখার জন্য। আজ আমি বড্ড একলা সাহারার মরুপথের শুষ্ক বৃক্ষের মত ।  একাকীত্ব যে কতটা ভয়াবহ , সেটা প্রত্যেকটা নিঃসঙ্গ ব্যাক্তি বুঝে ।

  
এক বছর আগের রাত এর কথা মনে পড়লে আজ ও আমার শরীর শিহরিত হয়ে উঠে । সেই রাতে আমি এতটা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম যে , বিছানা থেকে উঠার শক্তি ও হাড়িয়ে ফেলেছিলাম । কেউ যে আমাকে এক ফোঁটা জল দিয়ে তৃষ্ণা মিটাবে তেমন কাউকে পাই নি ।  সে রাত সারারাত ছটফটানি করেছি শুধু একটা মানুষের সঙ্গের জন্য । সত্যি আজকাল আমাকে অনেক ভাবাই , শেষ জীবনে সঙ্গিহীন  জীবন কীভাবে কাটাব ?  জীবনের শেষ অবধি আগলে রাখার জন্য হলে ও একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী সত্যি প্রত্যেকের দরকার। জীবনের সঠিক সময়ে যদি আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করি , তার মাশুল আমাদের সুদে আসলে হয়ত দিতে হয় । জানিনা জীবনের সেই ভুল সংশোধনের আজ বিন্দুমাত্র সুযোগ আছে ।
আজ বড্ড ঈর্ষা হয় অঞ্জন দা আর মহেশকে দেখে । কি সুন্দর!তারা একসাথে ২২ বছর একসাথে কাটিয়ে দিচ্ছে ‌। দুজনে একসাথে ঘুরতে যায় , খাওয়া দাওয়া সবকিছু যেন তাদের একসাথে হয় । এই অঞ্জন দা এক সময় আমকে প্রচন্ড জ্ঞান দিতেন , এসব ঠিক না । এভাবে হাজার পুরুষের সাথে বিছানা ভাগাভাগি করিও না , ভালোবেসে কাউকে আপন করে নেও। দেখবে জীবন অনেক সুন্দর জীবন হবে । জীবনের শেষ অবধি ভরসা করার একটা মানুষ তো কাছে পাবে । এটা সেটা , আরো কত বুলি আওড়াতে থাকত আমার কানের কাছে । কিন্তু সেসব  কথা তখন মূল্য না দিলেও , আজ হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছি সে কথাগুলো হিরের মতো মূল্যবান ছিল। তাদের কথা শুনলে হয়ত, আজ আমার পাশে ও একজন থাকত ।
যৌবনের জ্বালায় রঙীন চশমা পড়ে ছিলাম , যেটা দেখতাম সেটাতে নেশা ধরে যেত । তারপর ভোগ করার পর নেশার বোধ কেটে যেত , শেষ হয়ে যেত তার প্রতি  ইচ্ছা ,কামনা সবকিছু । ভালোবাসতে নয় আমি তখন  নিজের কামনা ভোগের  জন্য ইচ্ছে মতো খেলতাম কারো শরীর বা কখনো কারো মন নিয়ে ।

তবে সময় আমাকে বদলে দিয়েছে , শিক্ষা দিয়েছে অনেক কিছু । আজকাল একজন সঙ্গীর গুরুত্ব  প্রতিটা সময়  আমাকে  বুঝিয়ে দেয়।
ওই যে কথায় আছে “, যাহা চায় না ,তাহাই ভুল করে পাই,
আর যাহা চাই ,  তা পায় না “
ঠিক তেমনি হচ্ছে আমার সাথে , আমি চাইলে আজ কেউ আমার জীবন সঙ্গী হতে ইচ্ছুক নয় । শেষ তিন বছরে কতবার প্রস্তাব দিয়েছি , প্রেমের নয় সরাসরি বিয়ের জন্য । কিন্তু আমার প্রস্তাবে কেউ রাজি হয়নি, উল্টো প্রস্থান করেছে , অপমানিত হয়েছি। এভাবে খুঁজে কি সত্যিকারের কাউকে পাওয়া যায় ? হয়ত পাবো না , এভাবে আরো মানুষ আমাকে ফিরিয়ে দিবে , অপমান করবে আমার অতীতের কর্মকাণ্ড নিয়ে । হয়ত আবার ও গালি শুনতে হবে , “বুড়া বয়সের ভিমরতি হয়েছে বলে”.

জীবনের প্রতি বড্ড বিতৃষ্ণা জন্মেছে বড্ড বেশী, জীবন মায়া ত্যাগ করে মাঝেমধ্যে উড়াল দিতে ইচ্ছে করে অজানায়।
সবার জীবনে কোনো না কোনো নিংসঙ্গতা কাজ করে । কিন্তু সেই কালো মেঘ দূর হয়েও রোদের ও দেখা মেলে । কিন্তু আমার আকাশে আজো ঘোর অমাবস্যা ।
নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের মতো আমি  ও একা একা বসে বসে থাকি রোজ , ভোর থেকে কখন রাত হয়ে যায় চিন্তা করতে করতে ভবিষ্যত নিয়ে।
মনে হাজারো প্রশ্ন নিয়ে প্রতিটা রাত পার করে দেয় , কিন্তু মনের কথাগুলো বোঝার কেউ নেই । সত্যি একটি কথা বলার লোক থাকলে মন্দ হত না ,যাকে আমার জমিয়ে রাখা সব গল্প  বলব ।
হয়ত ৪৫ বছরের এই জীবনে এসব আষাঢ়ে গল্প , হয়ত একাকী এই জীবন পার করে দিতে হবে জীবনের শেষ অবধি । জীবনের ভুলের মাশুল গুনতে হয় , ভুল কর্মের ফল ও ভুগতে হয় । আমাদের উচিত দন্ড থাকিতে দন্ডের মূল্য দেওয়া।

What's your reaction?
0Smile0Angry0LOL0Sad0Love

Add Comment