Skip to content Skip to sidebar Skip to footer

নির্যাতিতকেই দোষারোপ! আর কতদিন?

লেখক: ইয়াছিন আলী

সেজেগুজে বাড়ির বাইরে বের হয়েছে বলেই ধর্ষিত হয়েছে, বোরখা পরিধান করে চললে কিংবা বাড়িতে থাকলে কি আর ধর্ষণ হতো। এভাবে নারীকে বাইরে দেখলে পুরুষ কামার্ত হয় তাই ধর্ষণ হবেই। দোষ আসলে ধর্ষকের নয় বরং নারীর পোষাকের।
পুরুষ হয়ে নারীর মতো কোমড় দুলিয়ে চললে, শাড়ি-চুড়ি পড়লে লোকে তো তোমাকে হিজরা বলবেই। লোকে বাঁকা চোখে দেখবেই। কেন, পুরুষের মতো চললেই তো আর এসব শুনতে হয় না, বৈষম্য হয় না।
 ধার্মিরা যা বিশ্বাস করুক না কেন তুমি কেন তাদের সমালোচনা করতে গেলে? তাদেরকে নিয়ে লিখলে তারা চাপাতি দিয়ে তো কোপাবেই। তাদের বিশ্বাস (কুসংস্কার) নিয়ে সমালোচনা করলে তারা অনুভূতিতে আঘাত পায়। তাই হত্যাকান্ডের জন্য কোন জঙ্গি নয় বরং তোমার লেখাই দায়ী।
তুমি সমকামী! এটা আবার প্রকাশ করতে হবে কেন? এই ব্যপারটা গোপন রাখতে সমস্যা কি? ঢাক ঢোল পিটায়া আবার অধিকার চাইতে হবে কেন? আত্ম প্রকাশ না করেও তো সেক্স করতেই পার। ঢাক-ঢোল পিটায়া যেমন অধিকার অধিকার বলে চিল্লাইছো, তো তোমার উপর হামলা তো হবেই। অধিকার অধিকার বলে যেমন চিল্লাও, তো এই হামলার জন্য তুমি নিজেই দায়ী।
একজন ব্যক্তি যা ইচ্ছা লিখতেই পারে। তুমি কেন সেটার বিরুদ্ধে কথা বলবে? কেন তার বিরুদ্ধে কথা বলবে? লেখার আগে তার অনুমতি নিছিলা? তুমি তো স্বাধীনতা বিরোধী।
ওদের শক্তি বেশি তাই ওরা ন্যায়-অন্যায় যা ইচ্ছা করুক। তুমি কেন প্রতিবাদ করতে গেলা? কেন একা চেচামেচি করতে গেলা? তুমি যে তোমার নিজের জীবনের সাথে তোমার পরিবারের জীবন, তোমার সঙ্গে মানুষদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছো এটা কি মাথায় আছে? এই ঝুঁকি তুমিই তৈরী করেছো। এসব চেচামেচি না করলে সব পরিস্থিতি শান্ত থাকত।
উপরের এই যে ছয়টা পয়েন্ট বললাম, এই কথাগুলো সুন্দর না? কোন ভেজাল আছে? না আমাদের মতো অধপতীত একটা জাতীর কাছে কথাগুলো অনেক সুন্দর। আমরা এভাবেই ভাবতে শিখেছি। গতানুগতিক এই ভাবনার স্রোতের বিপরীতে কেউ ভাবতে শিখলেই আমরা রে রে করে উঠি। অথচ আমরা যদি একটাবার আত্ম মন্থন করতাম তাহলে বিপরীত ভাবনার স্বরুপ সহজেই বুঝতে পারতাম। আমরা যদি ভাবতে পারতাম, নারীর পোষাক যেমনই হোক না কেন তার জন্য পুরুষরা ধর্ষণের সার্টিফিকেট পেয়ে যায় না। অনেক পুরুষও তো ছোট ছোট পোষাক পরিধান করে। তো নারীরাও তো পোষাকের দোষ দিয়ে পুরুষকে ধর্ষণ করতে পারত। কামনা যেমন পুরুষদের আছে তেমনি নারীদেরও আছে। কিন্তু ঐ যে মানসিকতার তফাৎ।
কারও চলাফেরা নারী সূলভ হলেই সমাজ তাকে টিজ করার বৈধতা পেয়ে যায় না। কারণ সে তো সমাজের পুরুষালীদের ঘাড়ে চাপাতি ধরে নারী সূলভ আচরণ চাপিয়ে দিচ্ছে না। এখানে দোষটা সমাজেরই। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে আমরা ভিক্টিমকেই দোষারোপ করতে ভালোবাসি।
আবার তথাকথিত ধার্মিকরা ধর্মের নামে যা ইচ্ছা করতে পারে। তাদের একবারও ভাবার প্রয়োজন নেই যে তাদের তথাকথিত বিধানটি অন্যের অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে। অন্যের অধিকার হরণ করতে পারে। ধর্মগ্রন্থ নারীদের গৃহবন্দী বানাতে পারে, চিতার আগুনে পুড়তে পারে, দাসী বানাতে পারে, সমকামীদের হত্যা করার বিধান দিতে পারে। এইক্ষেত্রে ভাবার কোন আবশ্যকতাই কেউ খুঁজে পায় না যে এসব বিধান অপরের অধিকার কতটা হরণ করল। কিন্তু যখনই কেউ সেই বিধানের উপর যুক্তিক প্রশ্ন তুলল। যার অধিকার হরণ করা হয়েছে সে সেই বিধানকে অস্বীকার করল, ঠিক তখনই চলে এলো ধার্মিকদের অনুভূতিতে আঘাতের প্রশ্ন। অনুভূতিতে আঘাতের অজুহাতে ধার্মিকরা অপরের জীবন কেড়ে নেয়ার স্বাধীনতাও পেল। লেখার জবাব তারা লেখা দিয়ে দিতে পারে, সেখানে হত্যার সংস্কৃতি কেন?
মধুর আগে খাঁটি শব্দটি তখনই যোগ করতে হয়েছে যখন মধুতে ভেজাল ঢুকেছে। মধুতে যদি ভেজাল ঢুকানো না হতো তাহলে খাঁটি মধু বলে কোন শব্দ হতো না। সমাজে যদি লিঙ্গ বৈষম্য তৈরী না হতো তাহলে আলাদাভাবে সমকামীদের অধিকার চাইতে হতো না। যদি সমকামী এবং বিসমকামীদের ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা না হতো তাহলে সমকামীদের আত্মপ্রকাশ বলে কিছু থাকত না। যেহুতু বৈষম্যের জায়গা তৈরী হয়েছে তাই সমকামীদের অধিকার চাই, অধিকার চাই বলে ঢোল পেটাতেই হয়। সমাজ যেহেতু বিসমকামীদের বৈশিষ্ট্যগুলো সমকামীদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে তাই আত্মপ্রকাশ করে সমাজকে বলতেই হয় যেগুলো আমার উপর চাপানো হচ্ছে তা আমাকে ভাল রাখবে না। যারা এই কথা বলতে পারছে না তাদের জীবন যেমন নষ্ট হচ্ছে, তাদের সাথে আরও কিছু মানুষের জীবন নষ্ট হচ্ছে। যুগের পর যুগ ধরে এমনটা তো চলতে পারে না। তাই সবাইকে এই প্রতিবাদের ভাষা শেখাতে হবে। এজন্য সবাইকে মুক্তির পথে উদ্বুদ্ধ করতে হলে কিছু মানুষকে সাহসীকতার পরিচয় দিয়ে আত্মপ্রকাশ তো করতেই হবে। সমাজের ঘুণেধরা এইসব নিয়ম-নীতি কে ভেঙ্গে নতুন-নীতি প্রতিষ্ঠা করতে গেলে সমাজ কি বসে থাকবে? পরিবর্তন কি খুব সহজভাবে আসে? কোথাও কখনও সহজ ভাবে পরিবর্তন এসেছে? পরিবর্তন করতে গেলেই ভন্ডরা রৈ রৈ করে তেড়ে আসবে এটাই স্বাভাবিক। তাদেরকে মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে গেলে তবেই পরিবর্তন সাধিত হবে।
কাউকে হুঁমকি দিয়ে লেখা, মেরে ফেলব, কেটে ফেলব এসব লেখা কি সত্যিই স্বাধীনতার পর্যায়ে পড়ে। যে ব্যক্তি এসব লিখছে সে কি ভিক্টিম এর অনুমতি নিয়ে এসব লিখেছে? যদি সে ভিক্টিমের অনুমতি নিয়ে না লিখে তাহলে ভিক্টিম যখন প্রতিবাদ করে লিখে তখন কেন অনুমতির প্রসঙ্গ আসে?
অন্যায়ের প্রতিবাদ করার প্রয়োজন তখনই হয় যখন অন্যায়কারীরা বেশ শক্তিশালী এবং প্রতিষ্ঠিত হয়। যেখানে অন্যায়কারীরা সংখ্যায় কম সেখানে প্রতিবাদ করার প্রয়োজনই হয় না। প্রতিবাদকারীর সংখ্যা কমই হয় আর তারা নিজের কথা না ভেবেই প্রতিবাদ করে। এজন্যই ইতিহাস তাদেরকে মহান হিসেবে চিহ্নিত করে রাখে। তাই আপনার প্রতিবাদ করার ক্ষমতা না থাকলে চুপ থাকুন কিন্তু অন্য প্রতিবাদকারীর প্রতিবাদের ভাষাকে স্তব্ধ করতে যাবেন না।
অনেক শিক্ষিত ও সচেতন ব্যক্তিকে নির্যাতিতকেই দোষারোপ করতে দেখেছি। তারা একটু ভিন্ন ভাবেও চিন্তা করতে পারেন। আর গতানুগতিক ধারা থেকে বেড়িয়ে এসে চিন্তা করতে পারলেই নির্যাতীতকে দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে পারবেন।
What's your reaction?
0Smile0Angry0LOL0Sad0Love

Add Comment